সনাতন ধর্মে এবং বিশেষ করে গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতাদর্শে একাদশী ব্রত পালন অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টি বিধান এবং পারমার্থিক উন্নতির জন্য প্রতি মাসে দুটি করে বছরে মোট ২৪টি (মলমাস থাকলে ২৬টি) একাদশী ব্রত পালন করা হয়। ব্রত পালনের পাশাপাশি সঠিক সময়ে উপবাস ভঙ্গ বা 'পারণ' করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বৈষ্ণব মতে অনেক সময় স্মার্ত মতের চেয়ে একাদশী ১ দিন পরে পালিত হয়, কারণ বৈষ্ণবীয় রীতিনীতিতে অরুণোদয় বিদ্ধা বা দশমী বিদ্ধা একাদশী বর্জন করে শুদ্ধ দ্বাদশী যুক্ত একাদশী বা মহাদ্বাদশীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
ভক্তদের সুবিধার্থে নিচে ২০২৬ সালের সম্পূর্ণ বৈষ্ণব একাদশী তালিকা দেওয়া হলো। এখানে বাংলাদেশ (ঢাকা) এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (কলকাতা) স্থানীয় সময় অনুযায়ী পারণের সময়সূচী নিখুঁতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের বৈষ্ণব একাদশীর তারিখ ও পারণের সময়
| একাদশীর নাম | তারিখ (২০২৬) | পারণের সময় (বাংলাদেশ) | পারণের সময় (ভারত) |
|---|---|---|---|
| সফলা একাদশী | ১৪ জানুয়ারি, বুধবার | সকাল ০৬:৪৩ - ১০:০৯ | সকাল ০৬:২০ - ০৯:৪৫ |
| পুত্রদা একাদশী | ২৯ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার | সকাল ০৬:৪০ - ১০:১২ | সকাল ০৬:১৮ - ০৯:৪৯ |
| ষটতিলা একাদশী | ১৩ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার | সকাল ০৬:৩২ - ১০:১২ | সকাল ০৬:১১ - ০৯:৪৯ |
| ভৈমী বা জয়া একাদশী | ২৮ ফেব্রুয়ারি, শনিবার | সকাল ০৬:২১ - ১০:০৯ | সকাল ০৬:০১ - ০৯:৪৬ |
| বিজয়া একাদশী | ১৫ মার্চ, রবিবার | সকাল ০৬:০৭ - ০৯:৫৯ | সকাল ০৫:৪৮ - 0৯:৩৭ |
| আমলকী একাদশী | ২৯ মার্চ, রবিবার | সকাল ০৫:৫৩ - ০৯:৫১ | সকাল ০৫:৩৪ - ০৯:২৮ |
| পাপমোচনী একাদশী | ১৪ এপ্রিল, মঙ্গলবার | সকাল ০৫:৩৭ - ০৯:৪২ | সকাল ০৫:১৯ - ০৯:১৯ |
| কামদা একাদশী | ২৭ এপ্রিল, সোমবার | সকাল ০৫:২৬ - ০৯:৩৬ | সকাল ০৫:০৮ - ০৯:১৩ |
| বরূথিনী একাদশী | ১৩ মে, বুধবার | সকাল ০৫:১৬ - ০৯:৩২ | সকাল ০৪:৫৯ - ০৯:০৯ |
| মোহিনী একাদশী | ২৭ মে, বুধবার | সকাল ০৫:১১ - 0৯:৩১ | সকাল ০৪:৫৪ - ০৯:০৮ |
| অপরা একাদশী | ১১ জুন, বৃহস্পতিবার | সকাল ০৫:১০ - 0৯:章 | সকাল ০৪:৫৩ - ০৯:০৯ |
| পাণ্ডব নির্জলা একাদশী | ২৬ জুন, শুক্রবার | সকাল ০৫:১২ - ০৯:৩৫ | সকাল ০৪:৫৫ - ০৯:১২ |
| যোগিনী একাদশী | ১১ জুলাই, শনিবার | সকাল ০৫:১৭ - ০৯:৩৯ | সকাল ০৫:০০ - ০৯:১৬ |
| শয়ন বা পদ্মা একাদশী | ২৫ জুলাই, শনিবার | সকাল ০৫:২৩ - ০৯:追 | সকাল ০৫:০৫ - ০৯:১৯ |
| কামিকা একাদশী | ৯ আগস্ট, রবিবার | সকাল ০৫:৩০ - ০৯:৪৩ | সকাল ০৫:১২ - 0৯:২০ |
| পবিত্রারোপণ একাদশী | ২৪ আগস্ট, সোমবার | সকাল ০৫:Template - ০৯:৪৩ | সকাল ০৫:১৮ - ০৯:২০ |
| অন্নদা বা অজা একাদশী | ৮ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার | সকাল ০৫:৪১ - ০৯:৪১ | সকাল ০৫:২৪ - ০৯:১৮ |
| পার্শ্ব বা বামন একাদশী | ২২ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার | সকাল ০৫:৪৬ - ০৯:৩৮ | সকাল ০৫:২৮ - ০৯:১৫ |
| ইন্দিরা একাদশী | ৭ অক্টোবর, বুধবার | সকাল ০৫:৫২ - ০৯:৩৫ | সকাল ০৫:৩৩ - ০৯:১১ |
| পাশাঙ্কুশা একাদশী | ২১ অক্টোবর, বুধবার | সকাল ০৫:৫৮ - 0৯:৩৩ | সকাল ০৫:Explicit - ০৯:১০ |
| রমা একাদশী | ৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার | সকাল ০৬:০৬ - ০৯:৩৪ | সকাল ০৫:৪৬ - ০৯:১১ |
| উত্থান বা প্রবোধিনী একাদশী | ২০ নভেম্বর, শুক্রবার | সকাল ০৬:১৬ - ০৯:৩৭ | সকাল ০৫:৫৬ - ০৯:১৪ |
| উৎপন্না একাদশী | ৫ ডিসেম্বর, শনিবার | সকাল ০৬:২৭ - ০৯:৪৫ | সকাল ০৬:০৬ - ০৯:২২ |
| মোক্ষদা একাদশী | ২০ ডিসেম্বর, রবিবার | সকাল ০৬:৩৭ - ০৯:৫৩ | সকাল ০৬:১৫ - ০৯:৩০ |
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরের পারণের সময়গুলো ঢাকা ও কলকাতার সূর্যোদয়ের ওপর ভিত্তি করে বৈষ্ণব পঞ্জিকা অনুযায়ী তৈরি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আপনার জেলার সময়ের সাথে কয়েক মিনিট এদিক-ওদিক হতে পারে।)
শুদ্ধ বৈষ্ণব মতে একাদশী ব্রত পালনের নিয়মাবলী
বৈষ্ণবীয় রীতিনীতি অনুযায়ী একাদশী ব্রত পালনের ক্ষেত্রে আহার ও আচরণের শুদ্ধতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। নিচে বৈষ্ণব মতে একাদশী পালনের প্রধান কিছু নির্দেশিকা তুলে ধরা হলো:
কী কী খাওয়া বর্জনীয়?
- একাদশীর দিন সব ধরনের পঞ্চরবিшস্য বা শস্যজাতীয় খাবার (চাল, গম, যব, ডাল, সরিষা ও ভুট্টা) গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- সয়াবিন তেল, সরিষার তেল বা শস্য থেকে তৈরি যেকোনো তেল ব্যবহার করা যাবে না। রান্নায় খাঁটি ঘি বা সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা বৈষ্ণবসম্মত।
- কেনা গুঁড়ো মসলা, চিঁড়া, মুড়ি, সুজি এবং মধু এড়িয়ে চলা উচিত।
কী কী খাবার গ্রহণ করা যাবে?
- সবজির মধ্যে আলু, মিষ্টি আলু, পেঁপে, কাঁচকলা, ওল এবং বাদাম একাদশীর দিন খাওয়া যায়।
- যেকোনো ধরনের তাজা ফলমূল, তরল দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার (যেমন- নিজের ঘরে তৈরি ছানা, দই, মাখন) গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
- রান্নায় সাধারণ লবণের পরিবর্তে অবশ্যই খাঁটি সৈন্ধব লবণ ব্যবহার করতে হবে।
আধ্যাত্মিক কর্তব্য
বৈষ্ণব মতে একাদশীর মূল উদ্দেশ্য হলো ইন্দ্রিয় সংযম এবং শ্রীহরির নাম সংকীর্তনে মগ্ন থাকা। এই দিন জাগতিক আড্ডা বা আলস্য পরিহার করে বেশি বেশি জপ করা, ভগবানের গ্রন্থ (যেমন- শ্রীমদ্ভাগবত বা ভগবদ্গীতা) পাঠ করা এবং ভক্তসঙ্গে হরিকথা আলোচনা করা কর্তব্য।
পারণের গুরুত্ব ও সঠিক নিয়ম
একাদশী ব্রতের সম্পূর্ণ ফল লাভের জন্য নির্দিষ্ট দ্বাদশী তিথির মধ্যে পারণ মন্ত্র পাঠ করে ব্রত ভঙ্গ করতে হয়। পারণের দিন সকালে স্নান সেরে ভগবানকে পঞ্চরবিশস্য (অন্ন বা খিচুড়ি) ভোগ নিবেদন করে সেই মহাপ্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে পারণ সম্পন্ন করতে হয়। নির্দিষ্ট পারণ সময় পার হয়ে গেলে ব্রতের ফল খণ্ডিত হয় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
উপসংহার
আশা করি, ২০২৬ সালের এই বৈষ্ণব একাদশী তালিকাটি আপনার পারমার্থিক জীবনে সহায়ক হবে। শুদ্ধ নিয়ম মেনে ব্রত পালন করে পরমেশ্বর ভগবানের কৃপা লাভ করুন। একাদশী মাহাত্ম্য, ব্রতকথা এবং সনাতন ধর্মের অন্যান্য পুজো ও রীতিনীতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের আমার মন্দির ওয়েবসাইটের অন্যান্য ধর্মীয় আর্টিকেলগুলো নিয়মিত পড়ুন।
এছাড়াও, আপনি যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ইসকনের নির্দিষ্ট একাদশী চার্ট এবং উৎসবের দিনক্ষণগুলো দেখতে চান, তবে সরাসরি আমাদের এই লিংক থেকে ISKCON Ekadashi List বা ইসকন একাদশী তালিকাটি দেখে নিতে পারেন। বৈষ্ণব ক্যালেন্ডার ও একাদশীর শাস্ত্রীয় ভিত্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করতে আপনি উইকিপিডিয়ার একাদশী পেজ ভিজিট করতে পারেন। সবার জীবনে কৃষ্ণভক্তি বৃদ্ধি পাক, হরে কৃষ্ণ!





