বাংলার লোকসংস্কৃতি ও কৃষিনির্ভর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি উৎসব হল মনসা পূজা। ২০২৬ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার এই পূজা বিশেষ এক রূপে ধরা দেবে—যার নাম 'রন্না পূজা' বা 'অরন্ধন'। এটি ভদ্র সংক্রান্তি তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলা পঞ্জিকার ভাদ্র মাসের শেষ দিন এবং বিশ্বকর্মা পূজার (১৮ই সেপ্টেম্বর) ঠিক আগের দিন। এই সময়টায় বর্ষার মেঘ সরে যায়, নতুন ফসল ঘরে উঠতে শুরু করে—আর প্রকৃতির এই পরিবর্তনকে বরণ করতেই এই উৎসবের সূচনা।
'অরন্ধন' শব্দটির অর্থ 'রান্না না করা'। এই দিনের প্রধান আকর্ষণীয় নিয়ম হলো—গৃহিণীরা সেদিন চুলা জ্বালান না। তার বদলে আগের দিন (১৬ই সেপ্টেম্বর) তারা নানারকম পিঠা, পায়েস, সবজি ও মিষ্টান্ন রান্না করে রেখে দেন। ১৭ই সেপ্টেম্বর সকালে সেই সব খাবার প্রথমে দেবী মনসা ও অন্নপূর্ণাকে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়, তারপর তা পরিবারের সবাই মিলে প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই ব্রত পালন করলে ঘরে অন্নের অভাব দূর হয় এবং সারাবছর খিদের জ্বালা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
পূজার আচারের মধ্য দিয়ে বাড়ির রান্নাঘরকে পবিত্র করে তোলা হয়। একটি পবিত্র ঘট বা কলসি স্থাপন করে তাতে মনসা ঘট সাজানো হয় এবং ফনিমনসা বা শালুক গাছের ডাল দিয়ে তা অলংকৃত করা হয়। অনেক বাড়িতে মা মনসার পাশাপাশি পরিবারের ইষ্টদেবী বা অন্নপূর্ণার প্রতীকী আরাধনাও করা হয়। গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে সাতক্ষীরা, যশোর ও খুলনার মত জেলায়, এই দিনে মনসাতলা মন্দিরগুলোয় বাড়তি ভিড় জমে এবং বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়।
এই উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি কৃষক ও প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতার এক অনন্য প্রকাশ। ফসল ঘরে তোলার আগে প্রকৃতির কাছে মঙ্গল কামনা করা এবং সাপের মতো ক্ষতিকর প্রাণী থেকে নিজেদের রক্ষা পাওয়ার প্রার্থনাই এই পূজার মূল ভাবনা। পাশাপাশি, এই উৎসব গ্রামের মানুষকে একসূত্রে বাঁধে—প্রতিবেশীরা একসঙ্গে বসে প্রসাদ গ্রহণ করেন, ভোগ বিতরণ করেন এবং আনন্দ-উৎসব ভাগ করে নেন।
তবে একটি কথা মনে রাখা জরুরি—মনসা পূজা অঞ্চলভেদে বিভিন্ন তারিখে পালিত হয়ে থাকে। কোথাও এটি শ্রাবণ মাসের নাগ পঞ্চমীতে (যেমন ৩রা আগস্ট বা ১৭ই আগস্ট), আবার কোথাও ভাদ্র মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে (যেমন ২রা সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হয়। তবে ১৭ই সেপ্টেম্বর তারিখটি বিশেষভাবে 'রন্না পূজা' বা 'অরন্ধন' হিসেবে স্বীকৃত, যা বিশ্বকর্মা পূজার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্বণ।