
শুরু হতে বাকি
11 দিন 2 ঘণ্টা 21 মিনিট 1 সেকেন্ড

যোগিনী একাদশী হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র একাদশী ব্রত,যা আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে পালিত হয়। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই ব্রত পালন করলে গুরুতর পাপ থেকেও মুক্তি লাভ করা যায় এবং ভগবান বিষ্ণুর বিশেষ কৃপা লাভ হয়। বিশেষ করে পদ্ম পুরাণে যোগিনী একাদশীর মাহাত্ম্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হয়।
📅 স্মার্ত মতে একাদশী
তারিখ: ১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার
বাংলা তারিখ: ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
⏰ স্মার্ত মতে পারণ
১১ জুলাই ২০২৬ (শনিবার)
সকাল ৭:৩৭ থেকে ৯:৫৮ পর্যন্ত।
🌼 ইসকন (গৌড়ীয় বৈষ্ণব) মতে একাদশী
তারিখ: ১১ জুলাই ২০২৬, শনিবার
বাংলা তারিখ: ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
⏰ ইসকন মতে পারণ
১২ জুলাই ২০২৬ (রবিবার)
সকাল ৫:১৯ থেকে ৯:৪৮ পর্যন্ত।
🙏 অধিষ্ঠাত্রী দেবতা: ভগবান বামন (শ্রীবিষ্ণুর অবতার)
যোগিনী একাদশী হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র বৈষ্ণব ব্রত, যা আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে পালিত হয়। এই একাদশী ভগবান বিষ্ণুর প্রতি ভক্তি নিবেদন, উপবাস, আত্মশুদ্ধি এবং পাপমোচনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। পদ্ম পুরাণে যোগিনী একাদশীর মাহাত্ম্য বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে আন্তরিকভাবে এই ব্রত পালন করলে বহু জন্মের পাপকর্ম ক্ষয় হয় এবং ভগবানের কৃপা লাভ করা যায়। প্রতি বছর অসংখ্য ভক্ত যোগিনী একাদশী উপলক্ষে উপবাস পালন করেন, হরিনাম জপ করেন, গীতা ও ভাগবত পাঠ করেন এবং ভগবান শ্রীবিষ্ণুর পূজা-অর্চনা করেন। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে স্মার্ত মতে যোগিনী একাদশী পালিত হবে ১০ জুলাই, আর গৌড়ীয় বৈষ্ণব (ইসকন) মতে পালিত হবে ১১ জুলাই।
যোগিনী একাদশী সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায় পদ্ম পুরাণে। সেখানে রাজা কুবেরের উদ্যানরক্ষক হেমমালী-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। হেমমালীর দায়িত্ব ছিল প্রতিদিন মানসসরোবর থেকে সুগন্ধি ফুল সংগ্রহ করে মহাদেবের পূজার জন্য নিয়ে আসা। কিন্তু একদিন তিনি নিজের স্ত্রী বিশালাক্ষীর প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে কর্তব্য পালন করতে ভুলে যান। এতে রাজা কুবের অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিশাপ দেন।
অভিশপ্ত হেমমালী দীর্ঘদিন বন-জঙ্গলে কষ্টকর জীবনযাপন করেন। একসময় তিনি মহর্ষি মার্কণ্ডেয়ের আশ্রমে পৌঁছে নিজের দুঃখের কথা জানান। মহর্ষি তাঁকে যোগিনী একাদশী ব্রত পালনের উপদেশ দেন। হেমমালী আন্তরিক ভক্তিভরে ব্রত পালন করলে তিনি অভিশাপমুক্ত হন, রোগ থেকে সুস্থ হয়ে পুনরায় সুখ-সমৃদ্ধ জীবন ফিরে পান। এই কারণেই যোগিনী একাদশীকে পাপমোচনকারী এবং আত্মশুদ্ধির ব্রত হিসেবে গণ্য করা হয়।
যোগিনী একাদশী শুধুমাত্র উপবাসের দিন নয়; এটি আত্মসংযম, ঈশ্বরভক্তি এবং মানসিক পবিত্রতার একটি বিশেষ সাধনার দিন। এই দিনে ভক্তরা সংসারের ভোগবিলাস থেকে দূরে থেকে ভগবান বিষ্ণুর স্মরণে সময় কাটান। শাস্ত্র মতে, একাদশী ব্রত পালনের মাধ্যমে মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয় এবং জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
বিশ্বাস করা হয়, এই ব্রত পালন করলে গুরুতর পাপের প্রভাব হ্রাস পায়, সংসারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, পারিবারিক কল্যাণ বৃদ্ধি পায় এবং ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদ লাভ করা যায়। তাই বহু ভক্ত প্রতিবছর নিষ্ঠার সঙ্গে যোগিনী একাদশী ব্রত পালন করেন।
যোগিনী একাদশী ব্রত সাধারণত দশমী তিথি থেকেই শুরু হয়। দশমীর দিন সাত্ত্বিক নিরামিষ আহার গ্রহণ করে ব্রতের সংকল্প নেওয়া হয়। অনেক ভক্ত এই দিন থেকেই শস্যজাতীয় খাদ্য পরিহার করেন।
একাদশীর দিন ভোরে ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নান করে পরিষ্কার বস্ত্র পরিধান করতে হয়। এরপর ভগবান বিষ্ণু, শ্রীকৃষ্ণ অথবা বামনদেবের পূজা করা হয়। তুলসী পাতা, ফল, দুধ, মাখন, ক্ষীর, মধু ও অন্যান্য সাত্ত্বিক ভোগ নিবেদন করা হয়। সারাদিন হরিনাম জপ, গীতা পাঠ, বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ এবং শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত হয়।
সক্ষম ব্যক্তিরা নির্জলা উপবাস পালন করেন। তবে অসুস্থ, প্রবীণ, গর্ভবতী বা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা ফল, দুধ বা অনুমোদিত সাত্ত্বিক খাদ্য গ্রহণ করে ব্রত পালন করতে পারেন। ব্রতের মূল উদ্দেশ্য শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং ভগবানের প্রতি একাগ্র ভক্তি ও আত্মসংযম অনুশীলন করা।
একাদশী ব্রত সম্পূর্ণ হয় দ্বাদশী তিথিতে পারণের মাধ্যমে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পারণ করা উচিত।
২০২৬ সালে স্মার্ত মতে যোগিনী একাদশীর পারণের সময় ১১ জুলাই সকাল ৭:৩৭ থেকে সকাল ৯:৫৮ পর্যন্ত। ইসকন মতে পারণ হবে ১২ জুলাই সকাল ৫:১৯ থেকে সকাল ৯:৪৮ পর্যন্ত। পারণের আগে ভগবানকে প্রসাদ নিবেদন করে তুলসীযুক্ত প্রসাদ গ্রহণ করা উত্তম। অনেক ভক্ত এই সময় ব্রাহ্মণ, ভক্ত বা দরিদ্র মানুষকে অন্ন ও বস্ত্র দানও করে থাকেন।
যোগিনী একাদশীর দিনে ভগবানের নাম জপ, গীতা বা ভাগবত পাঠ, তুলসী পূজা, দান-পুণ্য এবং হরিনাম সংকীর্তন করা অত্যন্ত শুভ। অন্যদিকে অযথা ক্রোধ, মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, হিংসা, তামসিক আহার, মদ্যপান এবং আমিষ খাবার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্র মতে, একাদশী ব্রতের প্রকৃত ফল লাভ করতে হলে বাহ্যিক উপবাসের পাশাপাশি মন ও আচরণের পবিত্রতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যোগিনী একাদশী মানুষকে আত্মসংযম, কর্তব্যপরায়ণতা এবং ভগবানের প্রতি অটল বিশ্বাসের শিক্ষা দেয়। হেমমালীর কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভুলের জন্য অনুশোচনা এবং ঈশ্বরের শরণাপন্ন হলে জীবনে নতুন সূচনা সম্ভব। এই ব্রত কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, ভক্তি এবং নৈতিক জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।
যারা নিয়মিত একাদশী ব্রত পালন করেন, তাঁদের কাছে যোগিনী একাদশী বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি তিথি। ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করলে মানসিক শান্তি, আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং ভগবান বিষ্ণুর কৃপা লাভের আশা করা হয়। সেই কারণে প্রতিবছর এই পবিত্র তিথি হিন্দু সমাজে গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে পালিত হয়ে আসছে।