
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
এশিয়া ও উপমহাদেশের একমাত্র লাল বর্ণের জাগ্রত দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে। সর্বানন্দ দাস নামের এক সাধক প্রায় ৩০০ বছর আগে কামাখ্যা মন্দির থেকে শুরু করেন এই অনন্য পূজার রীতি।
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
🟡 শ্রীশ্রী রক্তবর্ণা দুর্গা মাতার মন্দির, পাঁচগাঁও, মৌলভীবাজার 🔴🙏 এশিয়ার একমাত্র জাগ্রত লাল দুর্গা, যেখানে ভক্তের বাধাহীন বিশ্বাস শুধু মায়ের কাছেই সীমাবদ্ধ 🕉️✨
মৌলভীবাজারের রাজনগরের অজপাড়াগাঁয়ে প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এশিয়ার একমাত্র লাল দুর্গার মন্দির। দেবীর রং এখানে লাল, স্বর্গীয় রক্তবর্ণা—যা শুধু পূজার রীতি নয়, সময়ের বুকে লেখা এক বিরল উপমহাদেশীয় ইতিহাসের সাক্ষর। স্বয়ং দেবী বরেণ্য হয়েছেন ভক্তের ডাকে, সেজন্য এই মন্দিরে আসা প্রতিটি ভক্তের কাছে দেবী তিনি স্বয়ং ‘জাগ্রতা’🌺🚩
🪔 শুরুর গল্প: যে কাহিনিতে রঙিন হলো বিরল এক লাল পূজা
সিলেট বিভাগের অলিগলি পেরিয়ে যখন কেউ মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামের সরু রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে গ্রাম্য নির্জনতা অনুভব করেন, তখন হঠাৎ চোখে পড়ে ধানক্ষেতের পর দৃষ্টিনন্দন এক মন্দির। এখানেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে এশিয়া মহাদেশের আর কোনও স্থানেই নজর না মেলা শ্রীশ্রী রক্তবর্ণা দুর্গা মাতার মন্দির। স্থানীয় ভক্তরা যাকে আপন করে ‘লাল দুর্গা’ নামে ডাকেন।
ঘটনার হাত ধরেই শুরু ইতিহাস। সময়টা প্রায় ৩০০ বছর আগে। তখন উপমহাদেশের আকাশ ছিল অন্যরকম আলোয় উদ্ভাসিত। পাঁচগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ দাস তখন কর্মসূত্রে আসামের শিবসাগর জেলায় মুন্সি পদে কর্মরত ছিলেন।
তিনি ছিলেন এক সিদ্ধ সাধক। শারদীয় দুর্গাপূজার সময় তিনি সংকল্প করলেন, কামাখ্যা ধামে গিয়ে কুমারী পূজা করবেন। সেইমতো তিনি কামাখ্যা মন্দিরে গিয়ে স্থানীয় সেবায়েতের সহায়তায় পঞ্চবর্ষীয়া কুমারী নির্বাচন করলেন। মহাষ্টমীর দিন সেই কুমারীকে আসনে বসিয়ে শুরু হলো ষোড়শোপচারে স্বয়ং ভগবতীরূপে পূজা। প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে পূজা চললো গভীর মন্ত্রোচ্চারণ ও অগ্নিচর্চায় মাতোয়ারা হয়ে।
ঘটলো এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। পূজা শেষ হবার পর সর্বানন্দ দেখলেন, কুমারী মেয়েটির গায়ের বর্ণ ধীরে ধীরে রক্তিম লাল রং ধারণ করছে। সেই দৃশ্যে বিস্মিত হয়ে সর্বানন্দ দেবীকে প্রশ্ন করলেন “মা, আমার পূজা কি সিদ্ধ হয়েছে?”
ঝলকে দেবী তখন】
উত্তরে ভগবতীর লীলাময় কণ্ঠ ভেসে এলো——‘হ্যাঁ তোর পূজা সিদ্ধ হয়েছে। এই লাল বর্ণে তোর গ্রামে (পাচগাঁও) আমি আবির্ভূতা হয়েছিলাম, এখন থেকে তুই এই মাতৃকালীকে ঠিক লাল বর্ণেই পূজা করিস।’
কিন্তু সর্বানন্দ তখনও নিশ্চিত নন। তিনি বললেন, “মা, তুমি আমার বাড়িতে যে আবির্ভূতা হয়েছিল তার প্রমাণ কী?” দেবী তখন বললেন, “তোদের দুর্গামণ্ডপের দেওয়ালে আজও আমার হাতের ছাপ রয়ে গেছে, যা তুই নিজ চোখে দেখতে পাবি।”
তারপর দেবী নিজের সেই লাল বর্ণ ও চিহ্ন সবই রেখে গেলেন পাঁচগাঁওয়ের মন্দিরে। সেই থেকেই পাঁচগাঁও-এ শুরু হয় লাল বর্ণের দুর্গাপূজা, যা উপমহাদেশের আর কোথাও নেই। শুধু ভারতের আসাম অঙ্গরাজ্যের কামাখ্যা মন্দির ও পাঁচগাঁও ছাড়া আর কোথাও এই লাল দুর্গা দেখতে পাওয়া যায় না বললেই চলে।
🔴 অনন্য লাল উপমহাদেশের একমাত্র জাগ্রত দেবী
“লাল দুর্গা” মানে এখানে কেবল রং নয়; বরং এটা এক অলৌকিক শক্তির প্রতীক। সাধক সর্বানন্দ দাসের পাঁচগাঁও-ফেরার পর দেবীর নির্দেশে এখানে একটি দুর্গামণ্ডপ তৈরি করা হয়। তিনি দেবীর লাল বর্ণের বিগ্রহ বানিয়ে সেই স্থানে স্থাপন করেন এবং মা দুর্গা চিরকালের জন্য আবির্ভূতা হন বলেই স্থানীয় ভক্তদের বিশ্বাস। তাই তাঁকে জাগ্রত দেবী বলা হয়।
পাঁচগাঁও এর এই দেবী মন্দিরটি এমনই পবিত্র যে, “জাগ্রত মা” রূপে ভক্তদের সমস্ত মানত পূরণ করেন। পূজার সময় দূর দূরান্ত থেকে ভক্তেরা হোমযজ্ঞ দেন, প্রদীপ ও আগরবাতি জ্বালান, আবার কেউ কেউ এখানে মানত পূর্ণ হতে পশু বলিও দিয়ে থাকেন।
দেবী দর্শনের জন্য পূজার সময় দর্শনার্থীদের পায়ে হেঁটে ২-৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় ভক্তদের ঢল এবং যানজট এড়াতে। অষ্টমী ও নবমী তিথিতে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে সেখানে। অক্টোবর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী একাই পূজার দিনে সপ্তমী ও নবমীতে প্রায় হাজারখানেক পাঁঠা ছয়-সাতটি মহিষ ও অগণিত হাঁস-কবুতর বলি দেওয়া হয় যা অতি প্রাচীন রীতি।
✨ আজ ও আগামী: তিনশ বছর পেরিয়েও ভক্তির কখনও জৌলুস কমেনি
শুধু উপমহাদেশ থেকেই নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ভক্ত আসেন এখানে। আয়োজক বংশের ষষ্ঠ পুরুষ পূজা পরিচালক সঞ্জয় দাস, সংবাদমাধ্যমে জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাড়া এই পূজা কখনও বন্ধ হয়নি। তাঁদের পরিবারের পূর্ববর্তীদের উপার্জিত ও সংগৃহীত ব্যবস্থায় পুরোদমে এখনও দেবীর আরাধনা চলে আসছে।
লাল দুর্গার পূজা সাধারণ দুর্গাপূজা থেকে সময়গতভাবে ভিন্ন নয়, তবে পদ্ধতি ও বিশ্বাসের গভীরতা এখানে অন্য মাত্রা পায়। পূজার সময় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ও সিলেট,ঢাকা এমনকি ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকেও হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হন।
⛳ কীভাবে যাবেন, কী দেখবেন
মন্দিরটি মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তরে এবং রাজনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। সিলেট বা মৌলভীবাজার শহর থেকে সিএনজি বা বাসযোগে রাজনগর এসে সেখান থেকে অটোরিকশা নিয়ে পাঁচগাঁও গ্রামে পৌঁছানো যায়। ভক্তরা বছরের যেকোনো সময় দর্শন করতে পারেন, তবে সবচেয়ে বেশি জমজমাট পরিবেশ হয় আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা অর্থাৎ শারদীয় উৎসবের সময় দেবীর এই লাল রূপ দর্শনে সবার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
🎯 পাঁচগাঁও শুধু মন্দির নয়, গৌরবগাথার আরেক নাম
বাংলাভাষার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও পাঁচগাঁও বিশেষ আসনে অধিষ্ঠিত। ব্রিটিশ সময়ের লৌহশিল্পী জনার্দন কর্মকার ও বিপ্লবী লীলা নাগের জন্ম এই গ্রামেই।
লাল রঙের ঐতিহ্য যেন বলছে—জয় মা দুর্গা, জয় মা জাগ্রতী।
আপনি যদি উপমহাদেশের সবচেয়ে অনন্য অলৌকিক মন্দিরের সাক্ষী হতে চান তবে পাঁচগাঁওয়ের পথ ধরুন। দেবীর অনন্য লাল বর্ণের সাক্ষী হয়ে আপনার ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিস্ময় এখানে পূর্ণতা পাবে।
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।


