ছোটবেলায় একাদশী এলেই বাড়িতে অস্থিরতা লেগে যেত। ঠাকুমা সকাল থেকে পুজো-পাঠ শুরু করে দিতেন আর আমাদের ডাকতেন—"ওরা, আজ কিন্তু মুখে কিছু দিতে হবে না ভুলেও।" আর আমরা ভাইবোনরা তখন টিভির সামনে বসে চিপস খেতে গেলেই থামিয়ে দিতেন। বলতেন, "একাদশী মানে পঞ্চরবশস্য বর্জন, রবিশস্য মানে চাল-গম-ডাল-যব-শিম—এসব মুখে দিলে ব্রত ভঙ্গ হয়!"
শুরুতে খুব কষ্ট হতো। স্কুল থেকে ফিরে ভাত না খেয়ে কেমন জানি লাগত। কিন্তু ঠাকুমা বুঝিয়ে বলতেন, "এটা শুধু খিদে সহ্য করা না, এটা মনকে শুদ্ধ করার দিন।" ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এখনো একাদশী এলে আমার নিজের ঘরের রান্নায় চাল-ডাল তো দূর, এমনকি পেঁয়াজ-রসুনও রাখি না। সেদিন রান্না হয় একদম সাদামাটা—ফল, দুধ, ঘি, সাবু আর মিষ্টি আলু।
একাদশীর ব্রত পালনের মূল শর্ত হলো পঞ্চরবশস্য বা পাঁচ প্রকার শস্য বর্জন করা। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, এই দিনে ভগবান বিষ্ণুর পূজা ও উপবাসের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। কিন্তু অনেকেই বিভ্রান্ত হন যে, ঠিক কী কী খাবার এড়িয়ে চলবেন আর কী খেতে পারবেন। এই আর্টিকেলে একাদশীতে কি কি খাওয়া যাবে না তার একটি বিস্তারিত, নির্ভুল ও সহজ তালিকা দেওয়া হলো।
একাদশীতে নিষিদ্ধ খাবারের তালিকা
সনাতন ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, একাদশী তিথিতে নিচের ৫টি শ্রেণির খাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এগুলোর যেকোনো একটি ভুলবশতও খেলে ব্রত অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
১. ধান ও চালজাতীয় খাবার
- ধান থেকে তৈরি যেকোনো কিছুই একাদশীতে নিষিদ্ধ।
- প্রধান খাবার: সাদা ভাত, বাসমতি ভাত, লাল চালের ভাত।
- চালের তৈরি স্ন্যাকস: মুড়ি, চিঁড়া, খই, চালের পিঠা, চালের বড়া।
- প্রক্রিয়াজাত খাবার: চালের সুজি, চালের আটা দিয়ে তৈরি রুটি বা পরোটা।
সতর্কতা: অনেক সময় 'নিরামিষ' খাবার খাচ্ছেন ভেবে ভাতের তৈরি পায়েস বা খিচুড়ি খেয়ে ফেলেন, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
২. গম ও যবজাতীয় খাবার
শুধু চাল নয়, গম ও যব থেকেও তৈরি যেকোনো খাবার একাদশীতে খাওয়া যায় না।
- গম: আটা, ময়দা, ব্রেড, বিস্কুট, কেক, পাস্তা, ম্যাকারনি, গমের সুজি (সুজি সাধারণত গম বা চাল দুই রকমের হয়, তাই কেনার সময় লক্ষ্য রাখুন)।
- যব: যবের ছাতু, যবের রুটি, ভুট্টার খই অথবা ভুট্টার আটার তৈরী যেকোনো খাবার (যব ও ভুট্টা একই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত)।
৩. ডাল ও শিমজাতীয় খাবার
সকল প্রকার ডাল ও শিম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- মুগ ডাল, মাসকলাই ডাল, মুসুরি ডাল, অড়হর ডাল, খেসারি ডাল, ছোলা।
- কাঁচা শিম, বরবটি, মটরশুঁটি ইত্যাদি।
৪. নির্দিষ্ট তেল, লবণ ও মশলা
একাদশীর ব্রতে শুধু শস্যই নয়, কিছু নির্দিষ্ট তেল ও মশলাও বর্জন করতে হয়।
- তেল: সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, তিলের তেল। বিকল্প: আপনি ঘি অথবা সূর্যমুখী (সানফ্লাওয়ার) তেল ব্যবহার করতে পারেন (যদিও অনেক পণ্ডিত শুধু ঘি ব্যবহারের পরামর্শ দেন)।
- লবণ: সাধারণ সাদা লবণ (আয়োডিনযুক্ত) একেবারেই খাবেন না। এদিন শুধুমাত্র রক সল্ট (সৈন্ধব লবণ) ব্যবহার বৈধ।
- মশলা: পেঁয়াজ ও রসুন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া অতিরিক্ত গরম মসলা (গরম মশলা গুঁড়ো) ব্যবহার না করাই ভালো।
৫. অন্যান্য নিষিদ্ধ দ্রব্য
- আমিষ: মাংস, ডিম, মাছ সহ যেকোনো প্রাণিজ আমিষ খাওয়া যাবে না।
- নেশাদ্রব্য: চা, কফি, পান, সুপারি, তামাক, সিগারেট, অ্যালকোহল ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে।
অন্যের খাবার: ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, একাদশী তিথিতে কারও বাড়ির রান্না করা খাবার বা অন্যের দেওয়া খাবার গ্রহণ করা উচিত নয়। নিজে রান্না করেই প্রসাদ গ্রহণ করা উত্তম।
কেন এই খাবারগুলো একাদশীতে নিষিদ্ধ?
শাস্ত্রমতে, একাদশী হলো শুদ্ধি ও আত্মসংযমের দিন। চাল, গম, ডাল এই খাবারগুলোয় ময়দা বা গ্লুটেন উপাদান থাকে, যা হজম হতে সময় নেয়। এই খাবারগুলো বর্জন করলে শরীর হালকা হয়, যা ধ্যান ও প্রার্থনার জন্য সহায়ক। অন্যদিকে, পেঁয়াজ-রসুন ও লবণ তামসিক বা রাজসিক গুণসম্পন্ন খাবার, যা মনকে অশান্ত করে। তাই এই দিনে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক খাবার গ্রহণ করার বিধি রয়েছে।
FAQs (জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন)
প্রশ্ন ১: একাদশীতে দুধ ও দই খাওয়া যায় কি?
উত্তর: হ্যাঁ, দুধ, দই, ঘি ও ছানা একাদশীতে সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি খেলে ব্রত ভঙ্গ হয় না।
প্রশ্ন ২: একাদশীতে আলু ভাজা খাওয়া যাবে কি?
উত্তর: আলু খাওয়া যাবে, কিন্তু সেটি যদি ঘি বা সানফ্লাওয়ার তেলে ভাজা হয় এবং তাতে পেঁয়াজ-রসুন ও সাধারণ লবণ না থাকে, তাহলে খাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৩: ভুলবশত নিষিদ্ধ খাবার খেয়ে ফেললে কী করবেন?
উত্তর: আপনি যদি নিষিদ্ধ কোনো খাবার খেয়ে ফেলেন, তবে ব্রত ভঙ্গ হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে স্মরণপূর্বক মন থেকে ক্ষমা চেয়ে সেদিন আর কিছু না খেয়ে কেবল ফলমূল ও জল গ্রহণ করতে পারেন।





