সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির একটি বিখ্যাত শক্তিপীঠ। হিন্দু পুরাণ মতে, এখানে দেবী সতীর দক্ষিণ হস্ত (ডান হাত) পতিত হয়েছিল। ১১৫২ ফুট উঁচু এই পাহাড়চূড়ায় শিবপূজার জন্য প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের শিবচতুর্দশী তিথিতে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ভক্তের সমাগম হয় ও বিশাল মেলা বসে।
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ পাহাড়। এটি হিমালয় পর্বতের দক্ষিণ-পূর্ব শাখার একটি বর্ধিতাংশ। পাহাড়টির উচ্চতা প্রায় ১,১৫২ ফুট (৩৫১ মিটার)। এই পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় বিরাজ করছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অতি পবিত্র তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ মন্দির।
❝ পৌরাণিক কাহিনি ও সতীপীঠের মাহাত্ম্য ❞ পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, সত্যযুগে রাজা দক্ষের অপমান সহ্য করতে না পেরে দেবী সতী যজ্ঞকুণ্ডে দেহত্যাগ করলে বীরভদ্র শিব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। সৃষ্টির ধ্বংস রোধে ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডিত করলে দেবীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ৫১টি স্থানে পতিত হয়, যেগুলো শক্তিপীঠ নামে পরিচিতি লাভ করে। সেই মহাপীঠগুলোর একটি হলো এই চন্দ্রনাথ মন্দির। জনশ্রুতি আছে, এই স্থানে দেবী সতীর দক্ষিণ হস্ত (ডান হাত) পতিত হয়েছিল।
👑 ঐতিহাসিক সাক্ষ্য ও কিংবদন্তি ❞ মন্দিরটির পিছনে লুকিয়ে আছে আরও নানা ইতিহাস ও কিংবদন্তি। রাজমালা ও নিগমকল্পতরু গ্রন্থে উল্লেখ আছে, প্রায় ৮০০ বছর আগে গৌরের আদিশূরের বংশধর রাজা বিশ্বম্ভর সমুদ্রপথে চন্দ্রনাথে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন। তৎকালীন ত্রিপুরার শাসক রাজা ধন মানিক্য চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে শিবের মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিংবদন্তি আরও বলে, নেপালের এক রাজা স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে পৃথিবীর পাঁচ কোণে পাঁচটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন, যার মধ্যে এই চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শিবমন্দির অন্যতম। মহামুনি ভার্গব এখানে বসবাস করতেন এবং সীতাকুণ্ডের নামকরণের পেছনেও রয়েছে রামায়ণের কাহিনি। কথিত আছে, বনবাসকালে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ এখানে এসেছিলেন এবং সীতা এই কুণ্ডে স্নান করেছিলেন——যে কুণ্ডের নাম হয় সীতাকুণ্ড।
🏛️ স্থাপত্য ও জাগ্রত পীঠের উপাস্য দেবতা ❞ চন্দ্রনাথ মন্দির শিবের উপাসনালয় হিসেবে বিশেষভাবে জাগ্রত। এখানে আরাধ্য দেবতা হলেন ভগবান চন্দ্রনাথ (শিব) ও দেবী সতী (শক্তি)। পাহাড়চূড়ায় মূল মন্দিরে পৌঁছাতে ২,২০০ এরও অধিক সিঁড়ি পাড়ি দিতে হয়। পথিমধ্যে ভক্তদের চোখে পড়ে শত শত প্রাচীন মঠ, মন্দির ও স্মৃতিসৌধ। পাদদেশে রয়েছে ব্যাসকুণ্ড, ভৈরব মন্দির, বিরূপাক্ষ মন্দির, অন্নপূর্ণা মন্দির, পাতালকালী মন্দির, অক্ষয় বটবৃক্ষ, বিবেকানন্দ স্মৃতি পঞ্চবটি ও গিরিশ ধর্মশালা—সব মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশের বেশি সনাতন ধর্মীয় স্থাপনা।
🎉 শিবচতুর্দশী মেলা ও ভক্তের ঢল ❞ শুধু মন্দির নয়, এই পাহাড় তার অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ধর্মীয় উৎসবের জন্যও বিখ্যাত। প্রতি বছর বাংলা ফাল্গুন মাসের শিবচতুর্দশী তিথিতে (ইংরেজি ফেব্রুয়ারি-মার্চ) শুরু হয় প্রায় মাসব্যাপী শিবচতুর্দশী মেলা ও তীর্থযাত্রা। এই উৎসবকে ঘিরে সারা দেশ থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন। তথ্য মতে, শুধু ২০২৫ সালের মেলাতেই প্রায় ১০-২০ লাখ ভক্ত পাহাড়চূড়ায় পৌঁছান। মেলা ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে রেলওয়ে অতিরিক্ত ট্রেনের ব্যবস্থা করে এবং প্রশাসন তিনস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয় টেনে দেয়। তীর্থযাত্রীরা ব্যাসকুণ্ডে পুণ্যস্নান ও পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ শেষে দীর্ঘ সিঁড়ি ভেঙে মূল মন্দিরে পৌঁছে শিবদর্শন করেন।
🧭 কীভাবে যাবেন ও ভ্রমণ নির্দেশিকা ❞ বাসযোগে: ঢাকার সায়দাবাদ, কল্যাণপুর, ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী, হানিফ, এস.আলম, গ্রীনলাইন, সৌদিয়া প্রভৃতি পরিবহনের বাসযোগে সরাসরি সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ড।
ট্রেনযোগে: ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেনে করে সীতাকুণ্ড রেলওয়ে স্টেশনে নামতে পারেন। তীর্থের সময় বিশেষ ট্রেন যোগাযোগও থাকে।
পাহাড়ে ওঠার পথ: সীতাকুণ্ড বাজার থেকে অটোরিকশা বা রিকশায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গেট পর্যন্ত যান (প্রায় ১৫-২০ মিনিট)。সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ট্রেকিং করেই উপরে উঠতে হয়। উঠতে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
টিপস: আরামদায়ক ট্রেকিং জুতো ও পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে রাখা জরুরি। ভোরবেলা উঠলে গরম কম অনুভূত হয় এবং চূড়া থেকে সূর্যোদয়ের অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
চন্দ্রনাথ মন্দির ও পাহাড় শুধু একটি ধর্মীয় পীঠ নয়, এটি ইতিহাস, পুরাণ ও প্রকৃতির এক অপূর্ব মিলনস্থল। পাহাড়ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া, বিশ্বাসের টানে কষ্ট করে উপরে ওঠা বা শিবের চরণ স্পর্শ করা—সব মিলিয়ে এক অপার আধ্যাত্মিক তৃপ্তি এনে দেয় ভক্ত ও পর্যটকদের। তাই সময় করে একবার হলেও ঘুরে আসুন চট্টগ্রামের এই অমীয় তীর্থ থেকে। জয় চন্দ্রনাথ, জয় বাবা ভোলানাথ। 🙏⛰️
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।









