Faridpur Sridham Sri Angan
ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকায় অবস্থিত শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন বিংশ শতাব্দীর এক অসামান্য সমাজ সংস্কারক ও বৈষ্ণব ধর্মগুরু প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর কর্তৃক ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত。 মতুয়া ও মহানাম সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র এটি।
🏰 যেখানে মানবতার আরাধনা হয়: শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গনের ইতিহাস ও দর্শন ফরিদপুরের রাস্তা ধরে গোয়ালচামটের দিকে এগোলে যানজটের মাঝে একসময় চোখে পড়ে দারুণ সবুজে ঘেরা এক নির্মল পরিবেশ। প্রবেশপথে উড়ছে লাল ও সাদা পতাকা। সেখানেই শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন; যা বাংলার নিচু তথা পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য এক আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ডাহাপাড়ায় ১৮৭১ সালের ২৮ এপ্রিল এক অসামান্য আত্মার আবির্ভাব ঘটে। তাঁকে পরবর্তীতে আমরা চিনি প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দর নামে। পিতৃভূমি ফরিদপুরে এসে তিনি নিজের চোখে দেখলেন বৈষম্যের চরম রূপ। সেই তীব্র বেদনা থেকেই ১৮৯৯ সালে বাংলা ১৩০৬ সনের আষাঢ় মাসে রথযাত্রা উৎসবের দিন তিনি গোয়ালচামটের এই জমিতে একটি আখড়া স্থাপন করলেন। জমি দান করেছিলেন শ্রীরাম সুন্দর ও শ্রীরাম কুমারমুদি। তিনি জানতেন, সত্যিকারের ধর্ম মানেই সব মানুষকে সমান চোখে দেখা, বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র, বুনা, বাগদি, ডোম সম্প্রদায়কে উদ্ধার করা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শুধু সাধনাই নয়, বরং মানুষের সেবাই প্রকৃত উপাসনা। জাতি-ধর্ম-বর্ণের বেড়া ভেঙে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘জগদ্বন্ধু’——সারা জগতের বন্ধু।
🕯️ গম্ভীরালীলার আখড়া ও নিভৃত কুটিরের গল্প শ্রীঅঙ্গন চত্বরে হাঁটলে একটি বিশেষ জায়গায় টান পড়ে চোখ। বেশ কিছু গাছপালার আড়ালে, মন্দিরের কাছে একটি ছোট নির্জন কুঠিরি। এই কুঠিরিতেই দীর্ঘ ১৬ বছর ৮ মাস (বাংলা ১৩০৯ সন থেকে ১৩২৫ সন পর্যন্ত) প্রভু গম্ভীরালীলায় নিমগ্ন ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন একা, নীরবে মানবতার মুক্তির পথ খুঁজে পেতে। ভক্তরা আজও সেই পবিত্র কুটিরটির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা জানান। কেউ কেউ এখানে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন, প্রভুর সেই অলৌকিক উপস্থিতি যেন এখনো অনুভব করেন। কীর্তন যখন চলে মন্দির চত্বরে, তখন প্রতিটি শব্দ যেন প্রভুর সেই অবিনশ্বর অস্তিত্বকেই স্পর্শ করে।
আশ্রমের স্থাপত্য যেমন সাদামাটা, তেমনই তা অত্যন্ত নান্দনিক। মূল মন্দিরের শিখরটি এক সময় দূর থেকেও নজর কাড়তো। তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা সেই শিখর ডায়নামাইট দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। তবু আশ্রম প্রাঙ্গণ আজও তার গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে। মন্দির চত্বরে রয়েছে বৃহৎ একটি বটগাছ ও ধ্যানকক্ষ।
🎶 মহানামের করতাল ধ্বনি ও বার্ষিক উৎসব শ্রীঅঙ্গনে নিয়মিত পূজা-অর্চনার ধারা বজায় আছে। প্রতিদিন ভোর ও সন্ধ্যায় কীর্তন ও আরতি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর জন্মাষ্টমী ও রথযাত্রা ধুমধাম করে পালিত হয়। বিশেষ করে রথযাত্রা উপলক্ষে ফরিদপুরের গোয়ালচামট এলাকা জুড়ে বিরাট মেলা বসে এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হন।
ভক্তদের গভীর বিশ্বাস, এখানে একবার ‘মহানাম সংকীর্তনে’ অংশ নিলে অন্তরের সব দুঃখ দূর হয়ে যায়। কীর্তনের সময় ‘জয় জগদ্বন্ধু হরি’, ‘হরি বোল’ ধ্বনিতে আশ্রম চত্বর প্রকৃতই এক ‘মাতোয়ারা’ করে তোলে।
🩸 শ্রীঅঙ্গন গণহত্যা: ১৯৭১ সালের সেই কালরাত্রি ১৯৭১ সালের ২১শে এপ্রিল, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ফরিদপুরে অবতরণ করে। সন্ধ্যার দিকে বিহারী সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে তারা গোয়ালচামটের শ্রীঅঙ্গন আশ্রমে এসে থামে। তখন সন্ন্যাসীরা প্রার্থনা কক্ষে কীর্তন করছিলেন——‘জয় জগদ্বন্ধু হরি, জয় জয় জগদ্বন্ধু হরি’।
সহযোগীরা দাবি করেন, কীর্তনের এই ধ্বনি আসলে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, যা শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থনে গাওয়া হচ্ছে। এ অভিযোগেই ক্রুদ্ধ পাকিস্তানি সেনারা আশ্রম ঘেরাও করে ভেতরে প্রবেশ করে। আশ্রমের অধিকাংশ সন্ন্যাসী পালিয়ে গেলেও আটজন বীর সন্ন্যাসী সেখানেই থেকে যান।
তাদের টেনে এনে মন্দিরের সামনে চালতা গাছের নিচে দাঁড় করানো হয়। বারো রাউন্ড গুলি চালানো হয় । ‘জয় জগদ্বন্ধু হরি’ ধ্বনি গেয়ে গেয়ে শহীদ হন তারা।
তারপর আনুমানিক ২৬শে এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ডায়নামাইট দিয়ে মন্দিরের শিখর ধ্বংস করে দেয়। নিহত সন্ন্যাসীরা হলেন——কীর্তনব্রত ব্রহ্মচারী, নিধন বন্ধু ব্রহ্মচারী, অন্ধকানাই ব্রহ্মচারী, বান্ধুদাস ব্রহ্মচারী, ক্ষিতিবন্ধু ব্রহ্মচারী, গৌরবন্ধু ব্রহ্মচারী, চিরবন্ধু ব্রহ্মচারী ও রবিদাস ব্রহ্মচারী। পরবর্তীতে অমর বন্ধু ও হরিপ্রিয় ব্রহ্মচারী প্রভু জগদ্বন্ধুর পবিত্র দেহাবশেষ উদ্ধার করে ভারতে নিয়ে যান। এই গণহত্যার ঘটনা শ্রীঅঙ্গন গণহত্যা নামে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
🌄 কীভাবে যাবেন ও দেখার সময় ঢাকা থেকে যাতায়াত: গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে আজমেরি, আনন্দ, সূর্যমুখী ইত্যাদি বাসে ফরিদপুর行ে যান (ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা)। অথবা কমলাপুর থেকে ট্রেনে রাজবাড়ী বা ফরিদপুর হয়ে পৌঁছাতে পারেন。
ফরিদপুর শহরে যাওয়ার পর: বাস নেমে সিএনজি অটোরিক্সা নিন “গোয়ালচামটের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের কাছে শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন” বলে দিলেই পৌঁছে যাবেন।
🛏️ থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আশ্রম চত্বরে কোনও নির্দিষ্ট আবাসিক ব্যবস্থা না থাকলেও ফরিদপুর শহরে হোটেল র্যাফেল ইন, হোটেল পদ্মা, হোটেল লক্ষ্মী ইত্যাদি ভালো মানের হোটেল আছে। খাবারের জন্য মন্দির চত্বরের বাইরে বেশ কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে।
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।