
গ্যালারি






সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
শ্যামনগর উপজেলার ইশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত যশোরেশ্বরী কালী মন্দির ৫১ সতীপীঠের একটি। এই মন্দিরটি ১২শ শতকের শেষার্ধে 'অনরি' নামে এক ব্রাহ্মণ প্রথম নির্মাণ করেন এবং ১৩শ শতকে লক্ষ্মণ সেন সংস্কার করেন。এরপর ১৬শ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করান।
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
⚜️ পুরাণের কাহিনি ও মাহাত্ম্য সনাতন ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, সতী দেবী তাঁর পিতা দক্ষের যজ্ঞে স্বামী শিবের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মাহুতি দিলে, শিব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। সৃষ্টির ধ্বংস রোধে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহখণ্ড ৫১ টি ভাগে বিভক্ত করেন। এই ৫১টি ভাগ যেখানে যেখানে পতিত হয়, সেগুলো শক্তিপীঠ নামে পরিচিত। 'তন্ত্রচূড়ামণি'তে বলা হয়েছে, 'যশোরে পাণিপদ্ম দেবতা যশোরেশ্বরী / চণ্ডশ্চ ভৈরব যত্র তত্র সিদ্ধ ন সংশয়' (অর্থাৎ, যশোর অঞ্চলে দেবীর পাণিপদ্ম বা করকমল পড়েছিল। দেবী এখানে যশোরেশ্বরী নামে পরিচিত, আর ভৈরব হলেন চণ্ড)। এই মন্দিরেই সেই পবিত্র অংশটি পতিত হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয় এবং ভক্তদের কাছে এটি একটি অত্যন্ত জাগ্রত পীঠ হিসেবে বিবেচিত।
🏛️ ইতিহাস যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের পিছনে একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। কথিত আছে, একজন ব্রাহ্মণ ১২শ শতাব্দীর শেষ দিকে এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। পরে এটি ১৩শ শতকে লক্ষ্মণ সেন এবং ১৬শ শতকে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। রাজা প্রতাপাদিত্যই এই মন্দিরের কাছে একটি মসজিদ ও গির্জাও নির্মাণ করেছিলেন, যা ধর্মীয় সম্প্রীতির চিরন্তন উদাহরণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মন্দিরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু পরবর্তীতে এটি সংস্কার করা হয়।
🔱 দেবতা ও পূজা এই মন্দিরের কেন্দ্রীয় দেবী হলেন মা যশোরেশ্বরী কালী। মায়ের মূর্তিটি অত্যন্ত অনন্য। মুখমণ্ডলটি টকটকে লাল রঙের চাঁদোয়ার নিচে, কণ্ঠে রক্ত জবার মালা ও সোনার মুকুট পরিহিত অবস্থায় থাকে। দেবীর মূর্তির অবয়ব মখমলে আবৃত বলে কেবল মুখমণ্ডলই দৃশ্যমান হয়。 এখানে ভৈরব রূপে পূজা করা হয় ‘শ্রী শ্রী চণ্ড ভৈরব’ নামে。 নিয়মিত পূজা-অর্চনার পাশাপাশি কালীপূজা ও দূর্গোৎসব এখানে সর্বাধিক জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়。
🌸 ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক সফর ও মুকুট চুরির ঘটনা ২০২১ সালের ২৭শে মার্চ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরকালে এই পবিত্র মন্দির পরিদর্শন ও পূজা দান করেন। এই সফরকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন মন্দিরটি সংস্কার ও সাজসজ্জা করে。 ওই সময়েই তিনি মন্দিরকে স্বর্ণের একটি মুকুট উপহার দেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ১০ই অক্টোবর, নবমীর দিনে দুপুর আড়াইটার দিকে মন্দিরের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়ে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। কালীর প্রতিমার মাথার সেই স্বর্ণের মুকুটটি রহস্যজনকভাবে চুরি হয়ে যায়। প্রতিমার মাথার মুকুটটি রুপার তৈরি এবং তাতে স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া ছিল। ঘটনার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে চারজনকে গ্রেফতার করলেও মূল মুকুটটি এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি。 এই ঘটনায় মন্দিরের ট্রাস্টি বোর্ড পরিচালক জ্যোতি প্রকাশ চট্টোপাধ্যায় বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
☪️ ⛪ ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক হলো এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। মন্দিরের গায়ে কালীর পাশাপাশি ইসলাম ও খ্রিস্ট ধর্মের প্রতীকও খোদিত রয়েছে। এটি এই অঞ্চলের হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে শতাব্দী প্রাচীন সৌহার্দ্য ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের প্রতীক। এখানে শুধু হিন্দু ভক্তরাই আসেন না; অনেক মুসলিমও দেবী দর্শন ও মানত পূরণের জন্য এখানে ভিড় করেন। এই তীর্থস্থান প্রমাণ করে ধর্ম কখনও মানুষের মধ্যে প্রাচীর গড়তে পারে না, বরং সংস্কৃতি ও ইতিহাস মানুষকে বাঁধতে পারে একসূত্রে।
🌏 যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ভ্রমণ টিপস নিকটতম রেলওয়ে স্টেশন হলো সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া রেলওয়ে স্টেশন। সাতক্ষীরা সদর ও খুলনা শহর থেকে সরাসরি বাস যোগাযোগ বিদ্যমান। ঢাকা বা খুলনা থেকে বাসে চেপে প্রথমে সাতক্ষীরা শহরে নেমে সেখান থেকে সিএনজি বা বাসে শ্যামনগর উপজেলার ইশ্বরীপুর গ্রামে পৌঁছানো যায়। মন্দিরের ঠিকানা হলো 'ঈশ্বরীপুর গ্রাম'।
🌸 উপসংহার প্রাচীন ইতিহাস, জাগ্রত পীঠের মাহাত্ম্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির অপূর্ব চিত্র নিয়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় দাঁড়িয়ে আছে শ্রীশ্রী যশোরেশ্বরী কালী মন্দির। সতীর করকমল পতিত হওয়া এই পীঠস্থানটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি তীর্থ। এটি শুধু হিন্দু ভক্তদের কাছেই নয়, বরং সকল ধর্মের মানুষের কাছে এক অপার বিস্ময় ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির ঠিকানা।
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।