
সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ও জনপ্রিয় শক্তিপীঠগুলোর একটি হলো এই করুণাময়ী কালী মন্দির। ১৭০০ শতকের শেষ দিকে (প্রায় ৪০০ বছর আগে) নির্মিত এই মন্দিরটি জাগ্রত দেবী করুণাময়ী কালী মাতার জন্য বিখ্যাত। প্রাচীনকালে কোনো এক ব্যক্তির স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই মন্দিরটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। এর সঠিক প্রতিষ্ঠাকাল যদিও নথিভুক্ত না থাকলেও, ধারণা করা হয় এটি সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে বা অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে নির্মিত হয়েছিল। এটি শুধু একটি মন্দির না, একটি ইতিহাস, একটি কান্নার গল্প, আর বিশ্বাসের এক অবিচল ঠিকানা।
ইতিহাস ও কাহিনি: এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, বহুকাল আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক সন্তানহারা পিতার কাহিনি দিয়ে এই মন্দিরের শুরু। তার কন্যার মৃত্যুর পর পিতা স্বপ্নাদেশ পান মন্দির প্রতিষ্ঠার। তাঁর সেই কন্যার স্মৃতির সঙ্গেই মিশে আছে মা করুণাময়ীর এই পীঠের জন্ম। এই কারণে দেবী এখানে ‘করুণাময়ী’ নামে পূজিতা। অন্যমতে, কোনো এক সাধকের স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী এখানে কালীর একটি স্বয়ম্ভূ মূর্তি আবিষ্কৃত হয় এবং সেই স্থানেই গড়ে ওঠে এই উপাসনালয়। তবে সার্বজনীন ধর্মবিশ্বাস হলো, এখানে দেবী অতিশয় জাগ্রতা ও স্নেহময়ী থাকেন—যার চরণ ধরলে কান্না ধরে না, ভাষা ফুরিয়ে যায়, হৃদয় ভরে যায়। তাই তিনি ‘আনন্দময়ী’, তিনি ‘করুণাময়ী’।
মুখ্য মন্দির ও স্থাপত্য: মূল মন্দিরটি সাদা ও লাল রঙের সমন্বয়ে গঠিত একটি আয়তাকার কাঠামো। এতে রয়েছে একাধিক খিলান ও কারুকার্যখচিত প্রবেশপথ। গর্ভগৃহে মা করুণাময়ীর মূর্তি স্থাপিত—কালো কষ্টিপাথরের প্রতিমা, পরনে লাল শাড়ি, গলায় সাজানো ফুলের মালা আর সোনার অলংকার। চারপাশের আলো আর ধূপের গন্ধ মিলে সেখানে দাঁড়ালে মন অন্য এক জগতে ভেসে যায়। মন্দির চত্বরে আছে একটি নাটমন্দির ও ভক্তদের বসার ব্যবস্থা এবং একটি বটবৃক্ষ, যার নিচে বসে ভক্তেরা প্রার্থনা করেন ও মানত করেন।
মা আনন্দময়ী করুণাময়ীর রূপ: মন্দিরের এই দেবী মূর্তি একটি প্রস্তরখণ্ড। অখণ্ড বলয়ের প্রতীক হিসেবে ধারণা করেন ভক্তেরা। পাশেই ছোট একটি শিবলিঙ্গ বিরাজ করছে, যেখানে প্রতিদিন ও সোমবার বিশেষ পূজা দিতে ভক্তরা আসেন।
উৎসব ও পূজা: এ মন্দিরের প্রধান উৎসব হলো দীপাবলি ও কালীপূজা। দীপাবলির রাতে গোটা মন্দির হাজার হাজার প্রদীপের আলোয় সেজে ওঠে। ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মায়ের আরতি, কীর্তন ও মহাপ্রসাদ বিতরণ চলে। এছাড়া শিবচতুর্দশী, জন্মাষ্টমী ও অন্যান্য তিথিতেও বিশেষ আয়োজন রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৬টা ও সন্ধ্যা ৭টায় এখানে নিত্য পূজা ও আরতি অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি সম্প্রতি মন্দির কমিটি আয়োজন করছে আরও উন্নত পরিকাঠামোর, যাতে ভক্তরা সহজেই দর্শন করতে পারেন।
🙏 কখন আসবেন ও কিভাবে যাবেন: ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরটি ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি অবস্থিত। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে মেঘনা পরিবহন, শ্যামলী ও ইমাদ পরিবহনের নিয়মিত বাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। এসে বাসস্ট্যান্ড থেকে রিক্সা বা সিএনজি করে সহজেই মন্দিরে পৌঁছানো যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের দূরত্ব মাত্র ১–২ কিলোমিটার। সেখান থেকে রিকশায় মন্দিরে যাওয়া যায়। সড়ক ও রেলপথ উভয় মাধ্যমেই যাওয়ার ব্যবস্থা চমৎকার। ভক্তদের জন্য মন্দিরের নিকটবর্তী জায়গায় থাকার জন্য হোটেল ও ধর্মশালার ব্যবস্থা আছে। শীতকালে, বিশেষ করে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস এই মন্দির দর্শনের শ্রেষ্ঠ সময়, যদিও সারা বছরই ভক্ত ও পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।