Sri Sri Baba Loknath Brahmachari Sebashram (Chakrashala)
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার চক্রশালা গ্রামের এই পবিত্র সেবাশ্রমটি ভক্তদের কাছে এক অমৃত তীর্থ। শ্রীশ্রী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী, যিনি "রণে বনে" মন্ত্রের জন্য বিখ্যাত, তিনিই এখানকার আরাধ্য দেবতা। সাম্প্রতিককালে মন্দিরটির নবনির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে।
আমাদের এই গল্পের শুরু বহুদূর থেকে, প্রায় তিনশ বছর আগে। ১৭৩০ সালের ৩১শে আগস্ট, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের চাকলা গ্রামে এক ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেন এক মহাপুরুষ, যিনি পরবর্তীতে ‘বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী’ নামে অমর হয়ে যান。 শৈশবকালে গুরু ভগবান গাঙ্গুলির কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে তিনি চলে যান হিমালয়ের কঠিন সাধনায়। দীর্ঘ ৬০ বছর নির্জন গুহায় কঠোর তপস্যার পর তিনি আবার বেরিয়ে আসেন জনকল্যাণের পথে। সেই থেকেই তাঁর প্রচারিত আশীর্বাদমন্ত্র—“রণে বনে, জলে জঙ্গলে, যখনই বিপদে পড়িবে, আমাকে স্মরণ করিও, আমিই রক্ষা করিব।”
এবার সেই অলৌকিক বাবারই এক পুণ্য পীঠস্থানে আমরা যাব। সেটি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার চক্রশালা গ্রাম। নাম শুনলেই অনেকের মনে পড়ে যায় প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থ ও ইতিহাসের কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এই এলাকাটি পরিচিতি পেয়েছে শ্রীশ্রী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী সেবাশ্রমের জন্য। এটি নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলেও এত অল্প সময়েই ভক্তদের কাছে এক আশ্চর্য জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মন্দিরের স্থাপত্য ও নান্দনিকতা: একবার চক্রশালা গ্রামের পথ ধরে এগোলেই চোখে পড়ে দারুণ নান্দনিক একটি মন্দির। সাদা এবং লাল রঙের কারুকাজে সাজানো এর দেওয়াল যেন প্রার্থনার সুরে স্নাত। সামনের দিকে উঁচু প্রবেশপথ আর গম্বুজের নিচে স্থাপিত পাঁচটি বিগ্রহ। এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো একই চত্বরে পূজিত হচ্ছেন যুগলকিশোর রাধাকৃষ্ণ, পুরীর অধীশ্বর জগন্নাথ বলদেব সুভদ্রা মহারানী, পঞ্চতত্ত্ব গৌর নিতাই এবং ভোলানাথ মহাদেব।
মূল মন্দিরের একাংশে রয়েছে শ্রীশ্রী গীতা শিক্ষাকেন্দ্র। এটি একটি পাঠাগার ও ধর্মীয় শিক্ষালয় যেখানে নিয়মিত গীতা পাঠ, আলোচনা সভা এবং ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। এখানে আসা ভক্তরা প্রার্থনা শেষে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে পারেন, যে কোন আত্ম-শুদ্ধির কঠিন পথকে সহজ করে দেয় এই পরিবেশ।
উৎসব ও পূজা পরিচালনা: প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় এখানে সূর্যকিরণ ও সন্ধ্যারতির মধ্য দিয়ে আরতি অনুষ্ঠিত হয়। কালীপূজা, জন্মাষ্টমী ও শিবচতুর্দশীর মতো তিথিতে মন্দির চত্বরে ভক্তের ঢল নামে। তবে সবচেয়ে জমজমাট আয়োজন হয় নৃসিংহ চতুর্দশী উপলক্ষে। বিশেষ ভক্ত সমাগম ও কীর্তন মহোৎসব এখানকার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এই সময় গোটা এলাকা ‘জয় বাবা লোকনাথ’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বিষয় হলো, ভক্তদের জন্য এখানে কোনো বর্ণ বা গোত্রের ভেদাভেদ নেই। তাদের বিশ্বাস, বাবা লোকনাথকে স্মরণ করলেই তিনি ভক্তকে সর্বদা রক্ষা করেন। মন্দিরের পরিচালনা পরিষদ (যেখানে প্রকৌশলী বিবেক কান্তি দাশ, ডা. বিপ্লব কান্তি প্রমুখ ব্যক্তিত্ব যুক্ত) সাধ্যমতো সমাজসেবা ও শিক্ষা প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে。
বাবা লোকনাথ: কেন ভক্তদের কাছে তিনি অমর? যে-কোনো দুঃসময়ে ভক্তরা এখনো বাবা লোকনাথের নাম ভরসা হিসেবে নেন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠিত অগণিত আশ্রম আছে। তার মধ্যে বারদীর আশ্রম তো সবচেয়ে বিখ্যাত, কিন্তু পটিয়ার চক্রশালা সেবাশ্রমটি নবনির্মিত ও একান্ত ভক্তদের ভালোবাসায় তৈরী।
কীভাবে যাবেন ও সময়সূচি:
ঢাকা থেকে: সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে পটিয়া行ী বাসে চট্টগ্রাম আসুন (যেমন: শ্যামলী, হানিফ, ইমাদ)। বাস পটিয়া বাসস্ট্যান্ডে নামবে। সেখান থেকে সিএনজি যোগে সরাসরি মন্দির।
ট্রেনযোগে: চট্টগ্রাম স্টেশন বা ফেনী স্টেশন নেমে লোকাল ট্রেনে করে শেরপুর স্টেশন নামুন। মন্দির স্টেশন থেকে হাঁটা দূরত্বে。
ভিজিটিং সময়: প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বিশেষ পূজার সময় দীর্ঘ সময়ের জন্য খোলা রাখা হয়।
পরিশেষে: চক্রশালার এই সেবাশ্রম একটি জীবন্ত প্রমাণ যে সত্যিকারের আধ্যাত্মিকতা মন্দিরের সৌন্দর্যে নয়, বিশ্বাসের গভীরতায় লুকিয়ে থাকে। যারা শান্তি ও আশীর্বাদের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান, তাদের জন্য এটি যেন আধুনিক সময়ের এক মৌন গুরু। বাবা লোকনাথের সেই বাণী মনে রেখে— বিপদে বন্ধু তার আপনজন হয়ে ধরা দেন এখানে, শুধু একবার মন দিয়ে ডাকলেই। জয় বাবা লোকনাথ। 🙏
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।
রিভিউ লোড হচ্ছে...
এই মন্দিরের তথ্য আমাদের সিস্টেম দ্বারা যাচাইকৃত।