সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
শ্রীশ্রী চিনিশপুর কালী মন্দির নরসিংদী জেলার একটি অতি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক সনাতন তীর্থস্থান। এটি প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো। মা দক্ষিণাকালীকে উৎসর্গীকৃত এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন পরম মাতৃসাধক দ্বিজ রামপ্রসাদ।
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
শ্রীশ্রী চিনিশপুর কালী মন্দির বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে খুব কাছেই, নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর গ্রামে অবস্থিত। এটি ঢাকা বিভাগের আওতাধীন। ভক্তদের কাছে এটি 'চিনিশপুর কালীবাড়ি' নামেই সমধিক পরিচিত। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রহস্য ও অলৌকিকতার এক চমকপ্রদ ইতিহাস রয়েছে। প্রায় ২৫০ বছর আগে (আনুমানিক ১৭৬০ সালে) বীর সাধক ও পরম মাতৃসাধক দ্বিজ রামপ্রসাদ এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, দ্বিজ রামপ্রসাদ নাটোরের মহারাজা রামকৃষ্ণ রায়ের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন।
মন্দির প্রতিষ্ঠার কাহিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। দ্বিজ রামপ্রসাদ ‘চিন ক্রম’ নামের এক বিশেষ তান্ত্রিক সাধন প্রণালীতে অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁর এই সাধন পদ্ধতির নাম থেকেই গ্রামটির নাম হয় চিনিশপুর। দেবীর আদেশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি নরসিংদীর জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে আশ্রয় নেন। সেখানে একটি প্রাচীন বটবৃক্ষের নিচে পঞ্চমুখী আসন তৈরি করে কঠোর সাধনা শুরু করেন। বৈশাখ মাসের অমাবস্যা তিথিতে তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। তার সিদ্ধিলাভের পর সেই বটবৃক্ষটি তীর্থকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে থাকে। পরবর্তীতে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে তিনি এখানে দক্ষিণা কালীর মূর্তি স্থাপন করেন।
মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত নান্দনিক। মূল মন্দিরটির বাইরের দেয়ালে নানা ফুল ও পশুর মোটিফের কারুকাজ খোদিত আছে। মন্দিরের অভ্যন্তরে উত্তর দিকের দেওয়ালে মা কালীর প্রতীক যন্ত্র (য�ন্ত্র) স্থাপিত। মন্দিরে মায়ের মূর্তি না থাকলেও, এই যন্ত্রকেই মাতৃরূপে গণ্য করে পূজা করা হয়। মন্দিরের সামনেই একটি শিব মন্দির এবং বিশাল একটি পুকুর রয়েছে। বটবৃক্ষটি আজও মন্দিরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে।
এই মন্দিরের আরেকটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, এটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাথে জড়িত। বিপ্লবী মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বে এই মন্দির চত্বর ও প্রাচীন বটবৃক্ষের নিচে বসে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গোপনে প্রশিক্ষণ নিতেন ও দেশমাতৃকার জন্য জীবন বিসর্জনের দীক্ষা নিতেন。
মন্দির চত্বরে প্রতি বছর বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে বড় ধরনের উৎসব ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে মূল পূজা ও যাত্রা উৎসব জমজমাটভাবে পালিত হয়। এই সময় দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর আগমনে মন্দির চত্বর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মেলা উপলক্ষে নানা ধরনের লোকজ শিল্প ও কারুশিল্পের সমাহার ঘটে ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
বর্তমানে মন্দিরটি পুনরায় সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল মন্দিরের বাইরে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন নতুন মন্দির নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি সম্পন্ন হলে মন্দিরটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও দর্শনীয় কালী মন্দিরগুলির একটি হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।
জয় মা কালী। 🙏🌺
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।



