সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কড়লডেঙ্গা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই আশ্রমটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি অতিপবিত্র তীর্থস্থান। এটি বিশ্বের প্রথম দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল এবং এখানেই সত্যযুগে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি প্রথম দেবী দুর্গার পূজা করেন।
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সীমান্তবর্তী কড়লডেঙ্গা পাহাড়। আকাশছোঁয়া সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন সবার মন ছুঁতে চায়। সেই পাহাড়ের চূড়ায়, প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে আছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক অমৃত তীর্থ— শ্রীশ্রী চণ্ডীতীর্থ মেধস আশ্রম। পাহাড়ের গা বেয়ে প্রায় ১৪০টি সিঁড়ি পেরিয়ে ওপরে উঠলে একেবারে মাথার ওপরে যেন আকাশ আর পায়ের নিচে সবুজের সমারোহ। প্রকৃতির সাথে আধ্যাত্মিকতার এই অপূর্ব মিলন দর্শনার্থী ও ভক্তদের মন জুড়িয়ে দেয়।
📖 অধ্যায় ১: পৌরাণিক কাহিনি ও বিশ্বের প্রথম দুর্গাপূজা শ্রীশ্রীচণ্ডী ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, সত্যযুগে রাজা সুরথ তাঁর শত্রুদের কাছে রাজ্যহারা হয়ে একদা পাগলের মতো ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যান কড়লডেঙ্গা পাহাড়ের এক নির্জন অঞ্চলে। সেখানে তিনি ঋষি মেধস-এর আশ্রমে আশ্রয় নেন। তাঁর দুর্দশা দেখে মেধস মুনি তাঁকে হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য দেবী দুর্গার আরাধনা করার উপদেশ দেন। রাজা সুরথ এবং বৈশ্য সমাধি নামে আরেক ব্যক্তি মুনির নির্দেশ পূরণার্থে কঠোর নিয়মে দেবীর পূজা শুরু করেন। তখন থেকেই এই পাহাড়চূড়ায় প্রথম দুর্গাপূজার সূচনা হয় বলে ধারণা করা হয়। মার্কণ্ডেয় পুরাণানুযায়ী, দেবী দুর্গা মর্তে সর্বপ্রথম এই মেধস মুনির আশ্রমেই অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
দেবী সন্তুষ্ট হন এবং রাজা সুরথকে দিব্যদৃষ্টি দান করেন; তিনি শত্রুদের পরাস্ত করে আপন রাজ্য উদ্ধারে সক্ষম হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বঙ্গদেশের সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা উৎপন্ন হয়। তাই এই আশ্রমটিকে বিশ্বের প্রথম দুর্গাপূজার তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
🏛️ অধ্যায় ২: আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এই প্রাচীন আশ্রমটি বহু কাল ধরে প্রকৃতির আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ১৩৩ বছর আগে চট্টগ্রামের এক অসাধারণ সাধক শ্রীমদ বেদানন্দ স্বামী যোগবলে এই আশ্রমটির সঠিক অবস্থান আবিষ্কার করেন। তাঁরই উদ্যোগে কড়লডেঙ্গা পাহাড়ে আবারও গড়ে ওঠে বর্তমান আশ্রম কমপ্লেক্স। বেদানন্দ স্বামীর সাধনা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই আজ আমরা এই পবিত্র তীর্থ দর্শন করতে পারি。
🏛️ অধ্যায় ৩: আশ্রমের স্থাপত্য ও বিভিন্ন মন্দির আশ্রমের ফটক পেরিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার এগোতে হয়। তারপর শুরু হয় সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পালা। প্রায় ১৪০টি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলে দর্শনার্থীরা প্রথমে দেখতে পান শ্রী শ্রী গণেশ মন্দির。 কিছুটা এগোলেই চোখে পড়বে মূল মেধস মুনির মন্দির। মূল মন্দিরে পূজিত হন শ্রী শ্রী মৃন্ময়ী নামে খ্যাত দেবী দুর্গা। এর পরেই অবস্থিত মূল উপাসনালয় দেবী চণ্ডীর মন্দির।
আশ্রম চত্বরে প্রায় ১০টি মন্দির রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
শিব মন্দির
সীতা মন্দির
তারা কালী মন্দির
এছাড়াও আশ্রম চত্বরে একটি প্রাচীন সীতার পুকুর রয়েছে, যা স্নান ও আচার অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। মন্দিরের পেছনে সাধু সন্ন্যাসী ও তীর্থযাত্রীদের জন্য একটি দোতলা ভবন রয়েছে।
🎉 অধ্যায় ৪: উৎসব ও পূজা-অর্চনা আশ্রমটির সবচেয়ে জমজমাট সময় হলো শরৎকালীন দুর্গাপূজা ও বাসন্তী পূজা (চৈত্র মাস)। বাসন্তী পূজা উপলক্ষে আশ্রম চত্বরে নানা আয়োজন করা হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে সারা দেশ থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এখানে সমবেত হন। নিত্য পূজা ছাড়াও পূর্ণিমা ও অমাবস্যা তিথিতে বিশেষ আরতি ও পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সারা বছর এখানে পূজা, অর্চনা, কীর্তন ও ভজন চলে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের জুন মাসে ঐতিহ্যবাহী এই আশ্রম পরিচালনার জন্য ৮৫ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। নবগঠিত এই কমিটি আশ্রমের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি এর সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে।
🚩 অধ্যায় ৫: জমি বেদখলের ঘটনা ও বর্তমান সংকট এই পবিত্র তীর্থটি বর্তমানে এক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশ্রমের প্রায় ৫৫ একর ভূমি স্থানীয় কিছু অসাধু মহল বেদখল করেছে। জমি বেদখলের এই ঘটনায় আশ্রমের গঠন ও ভক্তদের জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণ ব্যাহত হচ্ছে। আশ্রম কমিটি ও স্থানীয় ভক্তরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন。
🧭 অধ্যায় ৬: কিভাবে যাবেন ও ভ্রমণ নির্দেশিকা যোগাযোগ: চট্টগ্রাম নগরীর যেকোনো স্থান থেকে বাসযোগে বোয়ালখালী বাসস্ট্যান্ডে নেমে সিএনজি অটোরিকশা বা রিকশা যোগে কড়লডেঙ্গা পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ওপরের দিকে উঠতে হয়।
সতর্কতা: শারীরিকভাবে সুস্থ ও সচেতন থাকলে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা কোনো সমস্যা নয়। তবে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য কিছুটা কষ্টকর হতে পারে, তাই আগে থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আসা ভালো।
ভ্রমণের সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ মাস আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং এই সময় দুর্গাপূজা ও বাসন্তী পূজার আমেজ থাকে। সকাল ও বিকেলের আলোয় পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা শ্রেয়।
✨ অধ্যায় ৭: শেষকথা শ্রীশ্রী চণ্ডীতীর্থ মেধস আশ্রম ইতিহাস, পুরাণ ও প্রকৃতির এক অনবদ্য মিলনমেলা। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করেন। এখানে আসলে আপনি শুধু একটি ধর্মীয় পীঠ দর্শনই করবেন না, বরং উপলব্ধি করবেন বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য দলিল—যার সত্যতা ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের প্রতিটি গায়ে, প্রতিটি নির্জন পথে।
জয় মা দুর্গা। জয় মেধস মুনি। 🙏🕊️
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।









