সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী গ্রামে অবস্থিত প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো এই মন্দিরটি বাংলার অন্যতম প্রাচীন ও জাগ্রত শক্তিপীঠ। মন্দিরের পাশের জোয়ার-ভাটার খালে স্নানের স্বপ্নাদেশের কাহিনি চিরকাল ভক্তদের কাছে অম্লান। প্রতি বছর চৈত্র মাসের বাৎসরিক কালীপূজা ও মেলা লক্ষাধিক পুণ্যার্থীকে আকর্ষণ করে।
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার বার্থী গ্রামে অবস্থিত শ্রীশ্রী তারা মায়ের মন্দির। বাংলার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ‘বার্থী কালীবাড়ি’ নামেই বেশি পরিচিত এই মন্দিরটি ইতিহাস, অলৌকিকতা ও বিশ্বাসের এক অপূর্ব মিলনমেলা। ধারণা করা হয়, প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর আগে আর্য যুগের প্রভাবেই এখানে দেবী আরাধনার সূচনা হয়। সেই প্রাচীন কালে বার্থী গ্রামটি ছিল ৩৬৫টি ব্রাহ্মণ পরিবারের আবাসস্থল, যারা জ্ঞান ও সাধনায় ব্রতী ছিলেন। ভূমির প্রাচীন সিএস ও আরএস রেকর্ড অনুযায়ী, জমিদারি আমলে ভূপতি কান্ত বক্সি (ভূপতিমোহন বক্সি) এবং তাঁর পূর্বপুরুষেরা এই মন্দির চত্বরের জন্য ব্যাপক ভূমিদান করেন। তাঁদের উদ্যোগেই প্রথম বৃহৎ আকারে মন্দিরটি সংস্কার লাভ করে। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে বরিশালের আরেক জমিদার রামলাল এবং স্থানীয় ভক্তদের আর্থিক সহায়তায় মন্দিরটির পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন ও বর্তমান কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়।
🪷 দেবীর স্বরূপ ও পূজাপদ্ধতি ‘তারা মা’ শব্দটির অর্থ ‘তারকার মতো দীপ্তিময়ী’ অথবা ত্রাতা। সনাতন শাস্ত্রমতে, তিনি স্বয়ং আদ্যাশক্তি ও মোক্ষদায়িনী। ভক্তেরা নিষ্ঠার সাথে পূজা করলে তিনি সকল দুঃখ-কষ্ট দূর করেন। তারা মায়ের মন্দিরের ভিতর মূল বিগ্রহ একটি কষ্টিপাথর (কালো পাথর) দিয়ে তৈরি, যা অলৌকিক শক্তির অধিকারিণী বলে বিবেচিত। বিশ্বাস করা হয়, সঠিক নিয়মে পূজা করলে দেবী ভক্তের মনোবাসনা পূরণ করেন। মন্দিরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত খালের সাথে জড়িয়ে আছে এক অপূর্ব লোকগাথা। বলিত আছে, দেবী তারা মা স্বপ্নাদেশ দিয়ে ভক্তদেরকে রোগ ও বিপদ থেকে মুক্তির জন্য এই জোয়ার-ভাটার খালে স্নান করার নির্দেশ দিতেন। সেই প্রাচীন বিশ্বাস আজও বহমান। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা মানত নিয়ে এখানে এসে খালে স্নান করেন এবং নিজেদের মানত পূরণ হলে নারকেল, সিঁদুর ও ফুল দিয়ে মায়ের চরণ অর্পণ করেন।
মূল মন্দির ছাড়াও কমপ্লেক্সে বেশ কিছু ছোট মন্দির ও পূজামণ্ডপ রয়েছে। মন্দিরের নির্মাণশৈলী বাংলার প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যরীতির অনুকরণে তৈরি হলেও সাম্প্রতিক কালে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের ফলে এতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। চারপাশের গ্রাম্য পরিবেশ, নির্মল বাতাস আর পাখির কলকাকলি মন্দির এলাকাকে স্বর্গীয় করে তুলেছে। এই পরিবেশ ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মন জুড়িয়ে দেয়।
🎉 বার্ষিক উৎসব ও ভক্তের ঢল বার্থী কালীবাড়ির সবচেয়ে জমজমাট সময় হলো চৈত্র মাসের বাৎসরিক কালীপূজা, মহোৎসব ও মেলা। এই সময় মন্দির চত্বর পরিণত হয় এক বিশাল তীর্থক্ষেত্রে। তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় ২-৩ লক্ষাধিক পুণ্যার্থী বার্থী গ্রামে সমবেত হন। পূজা উপলক্ষে আয়োজন করা হয় মহা আরতি, অষ্টমী পূজা, হোমযজ্ঞ, কীর্তন ও ভক্তিমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ভক্তদের জন্য বিশাল মহাপ্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা থাকে, যা সবাইকে ভক্তি ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে।
মেলায় দেশীয় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, সাবেকি পুতুলনাচ ও বিভিন্ন লোকজ খেলার আয়োজন মেলাকে জনপ্রিয় করে তোলে। এই মেলা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বরিশাল অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রদর্শনী।
🚩 কিভাবে যাবেন ও ভ্রমণ তথ্য যোগাযোগের মাধ্যম: বরিশাল নগরী থেকে বাস, সিএনজি অটোরিকশা বা প্রাইভেট কারযোগে গৌরনদী উপজেলার বার্থী গ্রামে যাওয়া যায়। বরিশাল সদর থেকে গৌরনদী প্রায় ২০ কিলোমিটার। বার্থী গ্রামটি উপজেলা সদর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বার্থী সেতু চোখে রেখে সহজেই মন্দির খুঁজে পাওয়া যায়।
ভ্রমণের সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ মাস আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং এই সময়ে ধর্মীয় উৎসব ও মেলার আমেজ থাকে। বিশেষ করে চৈত্র মাসের কালীপূজার সময়টাই বছরের সবচেয়ে জমজমাট সময়।
থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা: স্থানীয় কিছু স্বল্প ব্যবস্থার জন্য মন্দির কমিটির অতিথিশালায় থাকা যায়। উন্নত ব্যবস্থার জন্য বরিশাল শহরে হোটেল পাবেন। এলাকায় মেলার সময় খাবারের স্টল বসে কিন্তু অন্যান্য সময়ে নিজের খাবার সঙ্গে রাখা ভালো।
বার্থী তারা মায়ের মন্দির তাই শুধু একটি ধর্মীয় পীঠ নয়, বরং বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। যারা প্রকৃত ভক্তি ও অলৌকিকতার সাক্ষী হতে চান, তাদের অবশ্যই একবার দেখা উচিত এই অমীয় তীর্থ। এখানে পা রাখলেই চারপাশের নির্মলতা যেন আপনাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায় —যেখানে মা তারা নীরবে ডাকেন ‘এসো, এসো শান্তি নাও’।
জয় মা তারা। 🙏🌺
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।






