
গ্যালারি




সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি গ্রাম মতুয়া ধর্মের প্রধান তীর্থ। ১৮১২ সালে হরিচাঁদ ঠাকুর এখানে জন্ম নিয়ে জাতিভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। প্রতি বছর চৈত্র মাসে বারুণী স্নানোৎসব ও মেলা বসে। দূর-দূরান্ত থেকে লাখো ভক্ত কামনা সাগর ও শান্তি সাগরে পুণ্যস্নানে মাতে। জয় গুরু, হরি বোল! 🙏🌺
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলায় একটা ছোট্ট গ্রাম আছে – ওড়াকান্দি। চারপাশে শুধু সবুজ ধানক্ষেত আর নিঝুম গাছপালা। আর সেই গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মতুয়া ধর্মের সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান। বাংলার ইতিহাস আর সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন এই জায়গাটি।
সে কী কাহিনি ছিল, বলি শোনেন?
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। তখন সনাতন সমাজে জাতপাতের বেড়া ছিল একেবারে উঁচু। নিচু বর্ণের মানুষকে মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হতো না, পুকুর থেকে পানি তুলতে দেওয়া হতো না। ছোট ছোট কারণেই লাঞ্ছিত হতে হতো তাদের। এমনই এক নিম্নবর্ণীয় পরিবারে ১৮১২ সালের ১১ মার্চ সাফলিডাঙ্গা গ্রামে জন্ম নেন এক শিশু। তাঁর নাম হরিচাঁদ।
ছোট থেকেই তিনি চোখে দেখেছেন অত্যাচার আর বৈষম্য। কারণ শুধু তাঁর জন্ম কোনো 'উঁচু' ঘরে হয়নি। কিন্তু তিনি মাথা নত করেননি। তিনি ঘোষণা করলেন – "ঈশ্বরের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। হরি নামেই সব মলিন ঘুচে।"
তিনি শেখালেন, জটিল আচার-অনুষ্ঠান বা মন্দিরে ঢোকার দরকার নেই। শুধু সবার ভালোবাসা আর 'হরি বোল' বলা। যারা এই পথে মেতে ওঠেন, তারাই 'মতুয়া' – অর্থাৎ মাতোয়ারা। হরিচাঁদ ঠাকুর ওড়াকান্দি গ্রামেই স্থায়ী হন। আর এখানেই গড়ে ওঠে তাঁর সাধনার মূল আখড়া। পরবর্তীতে তাঁর ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুর এই মতুয়া ধর্মকে আরও ছড়িয়ে দেন দেশে বিদেশে।
ঠাকুরবাড়ির ভেতরে ঢুকলে প্রথমে চোখে পড়ে হরি মন্দির। সাদা-লাল রঙের এই মন্দিরের গায়ে লেখা আছে – 'জয় গুরু' আর 'হরি বোল'। পাশেই গুরুচাঁদ ঠাকুরের স্মৃতি ভবন। সেখানে তাঁদের ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও পুঁথি রাখা আছে। সবচেয়ে অবাক করা জিনিসটা হলো মন্দিরের সামনের দুটি বিশাল পুকুর – কামনা সাগর আর শান্তি সাগর। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এখানে স্নান করলে মনের সব ইচ্ছা পূরণ হয়।
কিন্তু ওড়াকান্দির আসল জৌলুস ধরা পড়ে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে। তখন এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ স্নানোৎসব বসে এখানে। দূর-দূরান্ত থেকে প্রায় দশ-পনেরো লাখ ভক্ত জড়ো হন। ভোর রাতে কামনা সাগরের পানিতে নেমে পড়েন – শুধু একবার মায়ের পদধূলি বুকের ওপর মাখতে। তাঁদের চোখে জল, মুখে শুধু ধ্বনি – 'হরি বোল, জয় গুরু'। ঢোল আর করতালের তালে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম। স্নান শেষে মন্দিরে গিয়ে প্রণাম জানান, মানত পূরণের জন্য মাটিতে গড়াগড়ি দেন কেউ কেউ। তিন দিন ধরে চলে মেলা। মতুয়া গান, পালাগান, আলোচনা সভায় মুখর থাকে চারপাশ।
এত বড় মেলা অথচ এখানে কোনো পশু বলি দেওয়া হয় না। কোনো বিলাসবহুল আয়োজন নেই। আছে শুধু আপামর মানুষের ভালোবাসা আর দৃঢ় বিশ্বাস। শুধু সিঁদুর, ফুল আর প্রসাদ বিতরণ। এমন সাদামাটা অথচ বিশাল আয়োজন।
শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার মতুয়ারাও ছুটে আসেন এই মেলায়। ২০২৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওড়াকান্দি এসেছিলেন। শুনে নিজের চোখেই না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যে – একটা ছোট গ্রামে এত বড় উৎসব হয়, এত মানুষের সমাগম হয়, অথচ অমানবিক কিছু ঘটে না শুধু ধর্মীয় ভীড়ে।
খুব সহজেই যাওয়া যায় ওড়াকান্দি। ঢাকা থেকে বাসে শ্যামলী, হানিফ বা সোহাগ নিয়ে কাশিয়ানী বাসস্ট্যান্ডে নামুন। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ২০-৩০ মিনিটে ঠাকুরবাড়ি। মেলা ছাড়া সময়ে আসলে নির্জন শান্ত পরিবেশে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারেন। নিজের মনকে যেন খুব কাছ থেকে অনুভব করেন।
ওড়াকান্দি শুধু একটা মন্দির বা দর্শনীয় জায়গা না। এটা এক ইতিহাস। এটা সেই কঠিন সময়ের সাক্ষী, যখন অন্ধকারের মধ্যেও একজন মানুষ ঘোষণা করেছিলেন – "হরি নামে সব হয়" – মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। তাই মানবতার জয়গান শুনতে, ইতিহাসের সেই পাতাটি নিজের চোখে দেখতে একবার না এলে মন ভরবে না।
জয় গুরু। হরি বোল। 🙏
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।