
গ্যালারি





সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
সিলেটের জিন্দাবাজারে অবস্থিত ১৭৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর আখড়া ব্রজবাসী শ্রী স্বরূপ চন্দ্র গোস্বামী মহারাজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন মন্দির
বিস্তারিত ইতিহাস ও বিবরণ
🕉️ জগন্নাথের আবির্ভাব: আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন সিলেটের বুকে তখনো আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি, গভীর আধ্যাত্মিকতার এক গন্ধ বয়ে আনলেন এক মহাপুরুষ। বৃন্দাবনের সেই পবিত্র ভূমি ছেড়ে ব্রজবাসী গোস্বামীর বংশধর শ্রী স্বরূপ চন্দ্র গোস্বামী মোহন্ত মহারাজ যখন সিলেটের মাটিতে পা রাখলেন, তখন তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে এলেন এক অনন্য দায়িত্ব। তাঁর স্বপ্নাদেশ ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনায় ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গড়ে ওঠে এই পবিত্র প্রতিষ্ঠান।।
সিলেটের বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত জিন্দাবাজার তখন ব্যস্ত হলেও গোস্বামী মহারাজ সেই ব্যস্ততার মাঝেই বেছে নিলেন ধর্মচর্চার জন্য এক নির্জন স্থান। এভাবে শুরু হয় জগন্নাথ জিউর আখড়ার পথচলা। ব্রজবাসী শ্রী স্বরূপ চন্দ্র গোস্বামীর পর তাঁর শিষ্য এবং পরবর্তী মহন্তগণ এই আখড়ার মূল সেবা-পূজা ও ভাবধারা অব্যাহত রেখেছেন, আজও তা একইভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে বহমান। যুগে যুগে নানা সংকট ও পটপরিবর্তন সত্ত্বেও এই আখড়া অটুট থেকেছে, যা সিলেটের হিন্দু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে আছে।
🌺 রথযাত্রা: ২০০ বছরের এক চিরন্তন মিলনমেলা: প্রতিবছর যখন গ্রীষ্মের উত্তাপ কিছুটা কমে আসে, আসাম-বঙ্গের ঘনিয়ে ওঠা বর্ষার আগেই সিলেটের বুক চিরে বয়ে যায় এক উৎসবের স্রোত। আর সেই উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু এই শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর আখড়া। সিলেট অঞ্চলে রথযাত্রা প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য, যা জগন্নাথদেবের প্রতি গভীর ভক্তি ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
জগন্নাথদেব, বলদেব ও সুভদ্রা মহারাণী যে অনন্য ত্রিমূর্তি, তা শুধু পুরীর মন্দিরেই নয়, সিলেটের মাটিতেও সমানভাবে পূজিত। এই আখড়া থেকেই প্রতি বছর নির্দিষ্ট তিথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা শুরু হয়। আখড়ার সেবায়েত ও ভক্তরা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে প্রথম দিন রথে ভগবান জগন্নাথকে স্থাপন করেন। পুরো রথটাকে সাজানো হয় রঙিন কাপড়, ফুল ও বাহারি সাজে。 এরপর রাত দিন নির্বিশেষে কীর্তনের সুরে মাতোয়ারা হয়ে দু’দিনব্যাপী রথ টানা হয় জিন্দাবাজার থেকে রিকাবীবাজারের রথতলায়।
এই সময় সিলেটের প্রায় ২৫টি মন্দির ও আখড়া একত্রিত হয়ে সহস্রাধিক ভক্ত নিয়ে এই রথ টানেন। “যেখানে জগন্নাথদেবের রথ যায়, সেখানে কোন পাপ থাকে না”——এই বিশ্বাস নিয়ে পুরো সিলেট নগর তখন পরিণত হয় এক উৎসবমুখর নগরীতে। রাস্তা থেকে মাঠ, সব জায়গা উপচে পড়া মানুষের ভিড়। কেউ কেউ বিশেষ মানত নিয়ে রথ টানেন, কেউবা শুধু একবার চোখ ভরে দেবদর্শন করতে আসেন। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জমজমাট মেলা বসে, যা বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রধান রথযাত্রার ৯ দিন পর উল্টো রথযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই দিন রথ পুনরায় জিন্দাবাজারের আখড়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। উল্টো রথযাত্রার দিনেও অগণিত ভক্তের পদচারণায় মুখরিত হয় পুরো রাস্তা। পুরো পথ ধরে ভক্তরা সিঁদুর, ফুল ও নানাবিধ উপাচার ছড়িয়ে দিয়ে ভগবান জগন্নাথকে বরণ করে নেন।
🎨 নানান স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: এই আখড়ার মূল মন্দিরটির স্থাপত্যে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আদল খুঁজে পাওয়া যায়। উচ্চ খিলানযুক্ত মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কারুকার্যে ফুটে উঠেছে পৌরাণিক কাহিনি ও ভাগবত কীর্তনলীলা।
মন্দির সংলগ্ন রয়েছে ভক্তদের থাকার জন্য গেস্ট রুম ও ধর্মীয় শিক্ষার পাঠাগার। নিয়মিত সন্ধ্যা ও সকালবেলা এখানে আয়োজিত হয় আরতি ও কীর্তন অনুষ্ঠান। বিশেষ করে নবমী ও দশমী তিথিতে এখানে আকর্ষণীয় পূজার আয়োজন চোখে পড়ার মতো।
⛳ কীভাবে যাবেন ও অন্যান্য তথ্য: আখড়ার অবস্থান জিন্দাবাজার এলাকায়। এটি সিলেট নগরীর একদম কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় যাতায়াত অত্যন্ত সহজ। সিলেটের যেকোনো প্রান্ত থেকে সিএনজি বা রিকশা নিয়ে “আর বি কমপ্লেক্স, পূর্ব জিন্দাবাজার” বা “জিন্দাবাজারের জগন্নাথ জিউর আখড়া” বলে দিলেই সোজা পৌঁছে যাবেন।
আপনার তোলা ছবি আছে?
মন্দিরের যেকোনো নতুন ছবি বা গ্যালারি আপডেট করতে পারেন।



